দুর্গা প্রতিমা গড়তে বেশ্যালয়ের মাটি অপরিহার্য কেন?

দুর্গা প্রতিমা গড়তে বেশ্যালয়ের মাটি অপরিহার্য কেন?
ছবিঃ গুগল
Advertisement

প্রতিমা নির্মাণ হোক কিংবা পূজা পদ্ধতি মা দুর্গার নির্দিষ্ট বিশেষত্ব আছে। পবিত্রতা শুভ্রতার প্রতিমূর্তি মা দূর্গা, অথচ তারই মূর্তি তৈরিতে দরকার হয় তথাকথিত ‘অশুচি’, ‘অপবিত্র’ এলাকার মাটি। যুগ যুগ ধরে এই প্রথা চলে আসছে।

বলা হয়ে থাকে, দুর্গা মূর্তি গড়তে অপরিহার্য বেশ্যালয়ের মাটি। অনেকেই হয়তো এই কতটা কোথাও না কোথাও শুনে থাকবেন। নাটক বা সিনেমাটা দেখেও থাকবেন। কিন্তু কেন এই প্রথার প্রচলন সেটা জানেন কি?

সমাজ যাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, অবজ্ঞা আর বঞ্চনা যাদের নিত্যসঙ্গী, ঘৃণার নোংরা দৃষ্টি ছাড়া যাদের ভাগ্যে আর কিছুই জোটে নি তাদের ঘরের মাটিই দেবীমূর্তির অপরিহার্য অঙ্গ। জন্ম নেওয়ার পরই কোনো মেয়ে পতিতা হয় না। সমাজ তাকে এই অন্ধকারে ঠেলে দেয়। কিন্তু আদিশক্তি তাদেরই কাছে টেনে নিয়েছে। তার ত্রিনয়নে সবাই সমান।

বলা হয় পুরুষ মানুষ যখন পতিতালয়ের নিয়ে বারাঙ্গনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন, তখন তিনি জীবনের সমস্ত সঞ্চিত পূর্ণ সেখানেই পেলে আসেন। সংগ্রহ করেন ঘোড়া ভর্তি পাপ। তাই ওই অঞ্চলের মাটি সব থেকে পবিত্র বলে ধরা হয়।

মানুষের ভিতরের উৎকট লালসা, কামনা, বাসনা কে নীলকণ্ঠের মত নিজে ধারণ করে বেশ্যারা সমাজকে শুদ্ধ ও নির্মল রাখে । তাদের প্রতি সম্মান জানাতেই পতিতালয়ের মাটি ব্যবহার করা।

তবে পৌরাণিক কাহিনী ও উঠে আসে এর পিছনে। পুরানে বলা আছে ঋষি বিশ্বামিত্র যখন ইন্দ্রত্ব লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করছিলেন, তখন তার ধ্যান ভাঙাতে উঠেপড়ে লাগেন দেবরাজ ইন্দ্র। স্বর্গের অপ্সরা মেনকাকে তিনি ঋষির ধ্যান ভঙ্গের জন্য পাঠান। অপ্সরার নাচে বিশ্বামিত্রের ধ্যান ভেঙ্গে যায়। রাজশ্রীর মত একজনের ধ্যান ভাঙানো খুব একটা সহজ কাজ নয়। অথচ এক অপ্সরা অবলীলায় সেই কঠিন কাজ সম্পন্ন করেন। কিন্তু মেনোকাতো সতী রমণীর পর্যায়ে পড়েন না।

সংস্কৃতে বলা হচ্ছে- অভিষিক্তা ভবেৎ বেশ্যা‌ ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে। অর্থাৎ দশমহাবিদ্যার আরাধনা করার জন্য যেসব নারীর মন্ত্র চৈতন্য হয়েছে এবং যারা এই মন্ত্রের গুণে দেবোত্তের অধিকারী হয়েছেন তারা হলেন বেশ্যা।

মহামায়ার মোট ৯টি রূপ নব কন্যা পূজিত হয়। নবম কন্যায় হলেন পতিতালয়ের প্রতিনিধি। অষ্ট কন্যার পর শেষ পূজাটি তাই তারাই পায়।সমাজ যাদের কোণঠাসা করে রাখে সারাবছর দেবী বন্দনায় তারাই পূজিত হন মানুষের মনে।

শক্ত মতে :-

দুর্গা মূলত শাক্ত সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবী। আর শাক্ত মতাদর্শ অনুযায়ী এখানে দেবী দুর্গাকে ‘নারী শক্তি’ রূপে কল্পনা করা হয়েছে। কারণ , যে অসুরকে প্রচন্ড শক্তিশালী দেবতাও কাবু করতে পারছিলেন না, তাকে বধ করলেন একজন নারী। শাক্ত সম্প্রদায়ের তন্ত্রশাস্ত্রে ‘গুপ্ত সাধনা’য় নব কন্যার বিবরণ পাওয়া যায়। এই নব কন্যা হলো-(১) নর্তকী বা অভিনেত্রী(২) কাপালিক (৩) পতিতা (৪) ধোপানি (৫) নাপিতিনী(৬) ব্রাহ্মণী (৭) শূদ্রানী(৮) গোয়ালিনী (৯) মালিনী

শাক্ত মতে যেহেতু মা দুর্গার পূজার প্রচলন। তাই শাক্ত মতাদর্শ অনুযায়ী, নবকন্যার প্রতীকস্বরূপ এই ৯ শ্রেণীর নারীর দ্বারের মাটি নেওয়া হয় প্রতিমা করতে। এই ৯ দ্বারের মাটি ছাড়া অপরিহার্য দুর্গা মূর্তি। এর সাথে সাত নদী, ৫১ শক্তিপীঠ এবং পঞ্চপ্রাণীর দেহাবশেষও ব্যবহৃত হয় প্রতিমা গড়ায়।

শাক্ত মতে মাটির প্রতিমার কোনো মূল্য নেই। যতক্ষণ না সে প্রতিমার অন্তর থেকে দর্শন জ্ঞানের উন্মেষ হয়। যে এই শক্তি দর্শন অনুভব করবে তখনি তার কাছে মাটির প্রতিমা হয়ে ওঠে চিন্ময়ী। দূর্গা পূজার মূল উদ্দেশ্য সমস্ত নারী জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। এই সম্মান পতিতার সাথে,সমস্ত নারী জাতির প্রাপ্য। শুধু তাই নয়, নারী জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে, কুমারী নবকন্যাদেরো পূজা করতে হয়। তবেই পূর্ণ হয় প্রতিমা গড়ার কাজ।

Advertisement